তুরিন আফরোজের তৃতীয় চিঠি
মা ও ভাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের অভিযোগের বিরুদ্ধে মৃত বাবার কাছে ধারাবাহিক খোলা চিঠি লিখছেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। এ বিষয়ে তুরিন আফরোজ বলেন, ‘বিচারাধীন একটি বিষয় নিয়ে আমি তো রাস্তায় বক্তব্য দিতে পারি না। মৃত বাপীর (বাবা) কাছে চিঠি দিয়ে জানালাম।’ ২৩ জুন, রোববার নিজের ফেসবুক পেজে তৃতীয় খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন তিনি। এর আগে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করেছেন যা একসাথে বাংলা রানারে প্রকাশিত হয়েছে। এবার পাঠকদের জন্য তার তৃতীয় পর্বের চিঠিটি তুলে ধরা হল-
বাপীর কাছে চিঠি - ৩
“সুপ্রিয় বাপী,
প্রেস কনফারেন্সে মামণি কেঁদে বললো, তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন আমি নাকি মামণিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। তুমি মারা গেলে ২০১৭ সালের ৩রা জানুয়ারী। ২০১৭ সালের ২রা মার্চ হয় তোমার মারা যাওয়ার ৫৮ দিন। কিন্তু গতকালের চিঠিতে আমি তোমাকে বলেছি তোমার একমাত্র ছেলে শিশিরই তোমার একমাত্র মেয়েকে তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। বাপী, তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন আমি কাউকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলিনি।
গতকালের চিঠিতে আরও বলেছি, আমি নোটিশ পেয়েই মামণির সাথে দেখা করতে চাইলাম এক তলায়। কিন্তু রাশি বলল, মামণি আমার সাথে কথা বলবে না, দেখাও করবে না। আমি আবার উপরে এসে শিশিরকে তার ইমেইল এর জবাব দিলাম। বাপী, আমি তোমাকে এটাও বলেছি যে, আমি শিশিরের ঐ নোটিশ পেয়ে ক্ষমতা দেখাতে যাইনি। আমি বড় আপু, ছোট আপু, র্যাব, ডিজিএফআই কাউকে খবর দেইনি। আমি একজন সাধারণ নাগরিকের মত পারিবারিক সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজেছি আপোষের মাধ্যমে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যা করা সম্ভব তা-ই করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছি।
বাপী, শিশিরের কাছে ইমেইল যখন পাঠালাম তখন ২০১৭ সালের ২রা মার্চ তারিখ (তোমার মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন) প্রায় দুপুর একটা বাজে। আমার সেদিন সদরঘাট থেকে লঞ্চ ধরে বরিশাল যাওয়ার কথা। ‘বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ’ তাদের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে সাত দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের তৃতীয় দিনে (৩রা এপ্রিল ২০১৭) আমাকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমার ট্রাইব্যুনাল অফিস থেকে দুই দিন আগেই (২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭) সব ব্যাবস্থা গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে আমার যাতায়াত, অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে দাপ্তরিক চিঠি প্রদান করেছিল (নীচে ছবি দিলাম)। সেই অনুসারে সেদিনই আমাকে বিকেল পাঁচটায় উত্তরার বাস ভবন থেকে রওনা হওয়ার কথা।
বাপী, তার মানে শিশিরের উচ্ছেদ নোটিশ পাওয়ার পর আমার হাতে ছিল মাত্র চার ঘন্টা। মন সায় দিচ্ছিল না বরিশাল যেতে। সুমেধাকে ঢাকাতে উত্তরার বাড়িতে একা রেখে দু’দিনের জন্য বরিশাল যেতে ভীষণ ভয় করছিল। বাড়িতে আমি থাকব না। যদি কোন অঘটন ঘটে! বাড়িতে থাকবে আর দুজন - লতা আর হাওয়া। দুজনই মহিলা মানুষ। এদিকে ব্যাগ প্যাক করাও হয়নি। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। আর মামণির আচরণও হতবাক করার মত। আমিও তো মা, বাপী। আমি ওই মূহুর্তে কী করতাম? এত অসহায় বোধ করছিলাম। প্রথমে ভাবলাম যাবো না। আয়োজকদের ফোন দিলাম নিজের অসুস্থতার কথা বলে। তারা বললেন, “আপা, আগামী কালের প্রোগ্রাম মাটি হয়ে যাবে। আমাদের মান সম্মান থাকবে না। প্লিজ, আপা, একটু কষ্ট করে আসুন।”
শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, থানায় একটা জিডি করে যাই। হাতে সময়ও কম। উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি করলাম (নীচে ছবি দিলাম)। জিডি নং- ৯১ তাং ০২/০৩/১৭। সেখানে লিখলাম – “আমি এই মর্মে জানাচ্ছি যে, ১৯৯৪ সাল হতে উপরের ঠিকানায় আমি ইসলামী শরীয়া মতে দানসূত্রে মালিক হয়ে একক ভাবে মালিকানাধীন আছি। পড়ালেখার কারণে বিদেশে অবস্থান হেতু আমার পক্ষে আমার পিতা (বর্তমানে মৃত) জমি ও বাড়ি দেখাশোনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। ২০০০ সালের পর ঐ জমিতে বাড়ির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আমি ঐ ঠিকানায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি এবং মালিকানা ভোগ করে আসছি অদ্যাবধি। অদ্য ২রা মার্চ ২০১৭ তারিখে সংযুক্ত স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে আমার কানাডা প্রবাসী ভাই ‘শিশির’, আমার মা এস নাহার তসলিম এবং ‘রাশি’ নাম্নী এক মহিলার যোগসাজশে, অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে আগামী ৩১শে মার্চ ২০১৭ ইং তারিখের মধ্যে আমার মালিকানাধীন ঐ বাড়ি হতে আমাকে বহিষ্কার করার হুমকি দিয়েছে। এরূপ হুমকি এবং উত্যক্তকরণ বে-আইনী এবং অসৎ উদ্দেশ্যমূলক। এ বিষয়ে যথাযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের নিমিত্তে আমি আপনার বরাবর এই সাধারণ ডায়েরি করলাম।”
বাপী, জিডি করলেও মাত্র নয় বছরের সুমেধাকে একা রেখে বরিশাল যেতে পারলাম না। তুমি চলে যাবার পর সুমেধা ছাড়া আমার আর কে বাকী রইলো? ওর কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। তাই জিডি করে এসেই ওর ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম তড়িঘড়ি করে। এরপর ঝড়ের মত সুমেধাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলাম বিকেল পাঁচটার সময়। বাপী, সারা রাত লঞ্চের ভিআইপি কেবিনে সুমেধাকে জড়িয়ে কাঁদলাম। বাপী, তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন বাড়ি থেকে আমাকে উচ্ছেদ কেন করতে চাইলো মামণি আর শিশির? মাথায় কিছু আসছিল না। আমি কি ক্ষতি করেছি ওদের? রাতে কেবিনে ডিম লাইট জ্বালিয়ে সুমেধার মাথাটা কোলে নিয়ে বিছানায় বসে কেবিনের পর্দা সরিয়ে নদীর পানি দেখছিলাম। চোখ থেকেও পানি বের হচ্ছিল বাপী। ঝাপসা হয়ে উঠছিল সব কিছু। জীবনের হিসেব মেলানো খুব কষ্টের।
সারা রাত জেগে ২০১৭ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখ ভোরে বরিশাল পৌঁছেই সার্কিট হাউজে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে রেডি হয়ে চলে গেলাম অনুষ্ঠান মঞ্চে। সাথে সুমেধা। বুকের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বাপী, কাউকে বুঝতে দেয়নি তোমার মেয়ে। বক্তৃতা ঠিকই দিলাম - হল ভর্তি লোকের করতালি, উচ্ছ্বাস, শুভেচ্ছা। কিন্তু বুকের কষ্ট গুলো শুধুই আমার আর সুমেধার। ‘বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ’ তাদের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে তোমার মেয়েকে শুভেচ্ছা স্মারক উপহারও দিল (নীচে ছবি দিলাম)।
অনেক গণমাধ্যমে রিপোর্ট বের হল। জনকণ্ঠ শিরোনাম করলো - “ইতিহাস বিকৃতকারীদের রূখে দাঁড়াতে হবে: তুরিন আফরোজ” (নীচে ছবি দিলাম)। সেখানে লেখা হোল- “স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করে নতুন প্রজন্মকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ গত ৪৬ বছর ধরে আমরা ইতিহাস রক্ষার লড়াই করে যাচ্ছি। বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। শুক্রবার বিকেলে বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমম্বয় পরিষদের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের তৃতীয়দিনে নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হলে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি আরও বলেন, টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট ক্রয় করে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধার কাঁতারে মিলে যাচ্ছে। তাদেরকে চিহ্নিত করতে প্রতি জেলায় রাজাকারের তালিকা করতে হবে। তালিকার সূচনা বরিশাল থেকে করার জন্যও তিনি আহবান করেন। সমন্বয় পরিষদের সভাপতি এ্যাডভোকেট এসএম ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাট্যজন সৈয়দ দুলাল, কাজল ঘোষ, শুভংকর চক্রবর্তী প্রমূখ।”
বাপী, আমি আর সুমেধা ঢাকা ফিরে এলাম ২০১৭ সালের মার্চের ৪ তারিখ ভোরে । ভয়ে দুরু দুরু বুকে। যদি আমাদের উত্তরার ‘অভিনন্দনে’ ঢুকতে না দেয়া হয়? যদি শিশির তার লোক বসিয়ে রাখে? বাপী, আমি আর সুমেধা তখন কোথায় যাব? আমাদের ওপর ততদিনে ৯ বার প্রাণঘাতী আক্রমণ করা হয়েছে। আমার সরকারি নিরাপত্তা ব্যাবস্থা ২০১৩ সাল থেকে এই বাড়িতেই বরাদ্দ করা হয়েছে। সেটা কীভাবে কী করব তাহলে? বাপী, এই হল তোমার মারা যাওয়ার পর ৫৮ দিন থেকে ৬০ দিনের আমার আর সুমেধার জীবন। ফিরে এসে দেখি মামণি বাড়িতে আছে কিন্তু বাড়ির দারোয়ানকে বলে দিয়েছে আমার বা সুমেধার সাথে কথা বলবে না। আমরা যেন একতলায় না ঢুকি। আমরা কোন ঝামেলা না করে তিন তলায় উঠে গেলাম।
এখন তুমি বল বাপী, এই যে প্রেস কনফারেন্সে মামণি কেঁদে বললো, তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিনের দিন আমি নাকি মামণিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এটা কি সত্য? আজকে সারা পৃথিবীর সকল মানুষ তোমার মেয়েকে ধিক্কার দিচ্ছে এই প্রেস কনফারেন্স দেখে। নোংরা ভাষায় গালি দিচ্ছে। বাপী, তুমি কি পারতে এগুলো শুনতে? বাপী, প্লিজ চুপ করে থেক না। মুখ ঘুরাবে না, তুমি আমার সাথে কথা বল। তোমার সুমেধাকে তুমি বোঝাবে না? বাপী, আমিও কি একদিন মা হয়ে এভাবে সুমেধাকে নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ তুলবো? মা হয়ে তাকেও কি আমি লোক ভাড়া করে নোংরা ভাষায় গালি শোনাবো? কেন বাপী? কুসন্তান হতে পারে, কিন্তু কুমাতা কি কখনো হয়?
বাপী, সবশেষে রাশির একটা স্টেটমেন্টের কাগজের ছবি দিলাম। ইচ্ছে করেই ওর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ওর ফোন নম্বর, ঠিকানা আর জাতিয় পরিচয় পত্র নম্বর প্রকাশ করলাম না। পড়লেই বুঝতে পারবে, মামণি কানাডা যাওয়ার আগে পর্যন্ত ২০১৭ সালের মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই বাড়িতেই ছিল। তারপর নিজের ইচ্ছায় মামণি শিশিরের কাছে কানাডা বেড়াতে গেল। বাপী, তাহলে তোমার মারা যাওয়ার পর ৫৮ দিনের দিনে আমি মামণিকে বাড়ি থেকে বের করে দিলাম কি করে? বাপী, মিথ্যা দিয়ে কি সত্যকে ঢাকা যায়? তুমি তো আমাকে সত্যের জন্য লড়াই করতে শিখিয়েছো। আমি তা-ই করবো, বাপী। তুমি যেখানেই থাক, আমার আর সুমেধার শক্তি হয়ে থেকো।
বাপী, কাল লিখবো তোমার মৃত্যুর পর কিভাবে আমাদের অতি চেনা মানুষগুলো তাদের খোলস পাল্টালো। জানি তোমার কষ্ট হবে শুনলে। কিন্তু বাপী, আমার কথাগুলো তুমি না শুনলে আর কে শুনবে? আমি জানি তুমি আমার আর সুমেধার আশে-পাশেই থাকো। হয়তো অনেকটুকুই তুমি জানো, দেখো। কিন্তু তবুও বাপী, আমাকে বলতে দিও – আমার হাল্কা লাগবে। ভাল থেকো।
ইতি
তোমার সেতু”
এর আগে গত ২০ জুন নিজ বাসায় প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করেন তুরিন আজেফরোর মা সামসুন নাহার তসলিম ও ভাই শাহনেওয়াজ আহমেদ শিশির। সংবাদ সম্মেলনে সামসুন নাহার তসলিম দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ প্রশাসনের সহায়তায় জোরপূর্বক তাঁর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘আমার শরীর ভীষণ খারাপ। কিডনির ৬৫ শতাংশ ড্যামেজ হয়ে গেছে, সঙ্গে প্রেশার ও ডায়াবেটিস আছে।’
‘এসবের ওষুধ কেনার পয়সা ভাড়ার টাকা থেকে পেতাম। সেটাও সে (তুরিন আফরোজ) কেড়ে নিয়েছে। দেশে থাকার জায়গা নেই, এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই। আমি এই বয়সে কেন আমার দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে পড়ে থাকব? আমার জন্মস্থান, আমার ৪৮ বছরের সংসার যেখানে, আমি সেখানেই থাকতে চাই।’ বলেন তুরিন আফরোজের মা সামসুন নাহার তসলিম।