সংখ্যালঘু:

এই মানুষগুলোর জন্য মানবতা চাই

সানাউল হক সানী
শনিবার, ২০ জুলাই, ২০১৯


আমাদের পাড়ার গনেশ কাকু, উৎপল দা, বন্ধু নারায়ণ, পরেশ, বাজারের চালের দোকানদার কার্তিক নানা সবার সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক। লক্ষ্মী মাসি কতবার মাথায় হাত বুলিয়ে আর্শিবাদ করেছে। স্কুলের সুরেন স্যারতো আমি বলতে অজ্ঞান। এরা আমাদের আত্নীয়-পরমাত্নীয়। শত বছরের বন্ধন যদি থাকে তবে সেখানে রক্তের সম্পর্ক গৌন বিষয়।

 কিছু অর্বাচিন পশু এসব মানুষগুলোকে জমি বা সম্পত্তির লোভে ‘মালায়ন’ বলে রাতের আধারে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। গুজবকে ইস্যু করে  ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়, ভাঙ্গচুর চালায়। শকুন্তুলা মাসির মেয়ে পূজাকে স্কুলে যেতে আসতে বাজে মন্তব্য, রাতের আধারে কলেজ পড়ুয়া পার্বতির রুমে ঢিল ছোড়া অর্বাচিনদের নিত্যদিনের কাজ। স্বার্থবাজ এসব মানুষের যুক্তি এরা ‘মালায়ন’। সুতরং ইন্ডিয়ায় চলে যাবে। 

একটু ভাবুনতো, হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এসব মানুষ আপনার প্রতিবেশী হয়ে বাস করছে। ইচ্ছে করলেই চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে পারবেন আপনি? যদি আপনি না পারেন তাহলে জমির লোভে অপরকে কেন বলেন? আমাদের পাশের পাড়ার দিপেন কাকু, মোড়লদের চাপে জমি বিক্রি করে ইন্ডিয়া চলে গেছে। 

শেষ দৃশ্যে তাকে দেখেছি ভিটে মাটিতে শুয়ে চুমো খেতে। পরম মমতায় ঘরের পাশের আম গাছটাকে তিনি জড়িয়ে ধরে কেদেঁছেন। বিক্রি করে দেওয়া গরুটাকে শেষবারের মত ছুঁয়ে অঝোড়ে ফেলেছেন চোখের জল। উদাস দৃষ্টিতে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেছেন অজানার পথে... 

পরিবার রেখে মাসখানিক পরে  তিনি একাই এসেছিলেন এপারে। সেই ছোটবেলার স্মৃতি বিজড়িত নদীর পাড়, খেলার মাঠ, দাস পাড়ার আম বাগান, রাস্তার কোনার তাস খেলার স্থানে একা একা হেটে বেড়িয়েছেন দুপুর পর্যন্ত। এরপর শুন্য ভিটায় শুয়ে থেকে মাটির গন্ধ নিয়েছেন প্রাণভরে। প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া গরুটাকে মাঠে বসে একাই আদর করেছেন ঝড়িয়ে ধরে, মাঠ থেকে ঘাস কেটে নিজ হাতে খাইয়েছেন। 

শেষ বিকেলে বাড়ির পাশের ডোবায় গোসল সেরে আবার ওপারের পথ ধরেছেন। সারদিনে তিনি খাননি কিছুই। অব্যক্ত কষ্টটা বুকে ধরে একরাশ ঘৃর্ণা রেখে আবারও চলে গেছেন। হয়ত আবারও আসবেন, এভাবেই জন্মের মাটি, আলো, বাতাসকে ভালবাসবেন। কিন্তু তিনি এদেশের মানুষ হতে পারবেন না। তাকে ‘মালায়ন’ বলে তাড়াতে হবে। কারণ, তা না হলে তো আর সম্পত্তি অল্প টাকায় কব্জা করা যাবে না। 

ভারতের নির্যাতিত সংখ্যালঘু, মায়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান সবার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটে থাকে। এ মানুষগুলোর জন্য একটা কথাই বলব, সহিসংতা নয় মানবতা চাই।
লেখক: সাংবাদিক

[প্রিয় পাঠক, মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে বাংলা রানার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। মুক্তমত কিংবা বাংলা রানারে প্রকাশিত কোন মতামতের প্রতিক্রিয়া পাঠাতে পারেন brtube717@gmail.com এই ঠিকানায়]