নারী অধিকার:

মেয়েদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি একচোখা খোঁয়াড়

আমিমুল এহসান
বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সব থেকে অসহায় ও ভয়ংকর এক অধ্যায় পার করছে। উদারপন্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাকা হলেও এখন অনেক বেশি গোড়ামিতে ভূগছে। এখানে মৌলবাদীদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। আমি দেখতে পাচ্ছি, সাংঘাতিক পর্যায়ের অন্ধরা এখানে বাস করে। নব্বইয়ের দশকে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা  এমন ছিলো না। ওই সময়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ছিলো যথেষ্ট লিবারেল। হয়ত সারা দেশের মানুষের ধারণা ছিলো এখানে মুক্তিবুদ্ধির চর্চা হয়। গোড়ামি ও ভাঁড়ামি করার লোক এখানে একটিও নেই। তখনকার দিনে মেয়েদের কাছে শাড়ি পরিধান করাটা ছিলো ফ্যাশন। হিজাব বাঁধার কথা তারা কল্পনাও করতো না।

এখনতো বাংলাদেশে হিজাবি মেয়ের সংখ্যা সবচে বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি বলতে চাচ্ছি না হিজাব পরিধান করাটা একেবারে খারাপ কিছু। যার যার স্বাধীনতা, কে কি পোশাক পরিধান করবে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। তারপরও মেয়েদের পোশাক নিয়ে আপত্তি উঠে। অনেকের কাছে হিজাব ছাড়া মেয়েরা নোংরা ও সহজলভ্য। ধর্ষণের জন্যও দায়ী করা হয় পোশাককে। তাই ধর্ষক পার পেয়ে যায়।

কচ্ছপের মত খোলসের ভেতর লুকিয়েও কারো কারো শেষ রক্ষা হয় না। পোশাক কি কাউকে রক্ষা করতে পারে! পারে না, কারণ শুধুমাত্র পোশাকের নিরাপত্তা দেবার কোন ক্ষমতা নেই। মানসিকতা উন্নত করতে না পারলে ধর্ষণ এড়ানো সম্ভব নয়। যারা মেয়েদের পোশাক নিয়ে তাচ্ছিল্য করে, খোটা দেয় তারা একেক জন ধর্ষকেরই নামান্তর। একটি দেশ সেরা উচ্চ বিদ্যাপীঠে মেয়েরা বন্দিনী। তাদের আটকে রাখা হয়। পা খোঁড়া করে দেয়া হয়েছে যাতে খুড়িয়ে চলে। পুরুষের থেকে দ্রুত যেন কোনভাবে না চলতে পারে। মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায় এ অসমতা। যেখানে ছেলেদের হলগুলো সারাবছর বন্ধ হয় না সেখানে মেয়েদের হলগুলো সাড়ে নটা বা দশটায় বন্ধ করে দেয়া হয়। তাদেরকে বাধ্য করা হয়। 

বলা হয়- তুমি মেয়ে, অতরাত অবধি বাইরে থাকার স্বাধীনতা তোমার নেই। প্রশ্ন উঠে, কেন? ছেলেরা তো থাকছে, যখন যেখানে খুশি যাচ্ছে, যা ইচ্ছে করছে। ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেরা সারারাত পলাশি, মেডিকেল মোড়, টিএসসি, আমতলা, বটতলা কাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আনন্দ করছে, হইচই করছে। আমের দিনে আম, বড়ইয়ের দিনে বড়ই, ডাবগাছগুলোর ডাব তারা দলবেঁধে পেড়ে খাচ্ছে। কেউ কিচ্ছু বলছে না। এটা তাদের ক্যাম্পাস, তারা যা খুশি করুক। ভার্সিটিতে এসে এইটুকু স্বাধীনতা তো তারা পাবেই। এ আর এমন কি!
 
কিন্তু ভিন্নতা কেবল মেয়েদের বেলায়। তারা ঘরে বন্দী থাকবে, লজ্জা নিয়ে থাকবে। তাদের থাকতে হবে মন ভরা লজ্জা, শরীর ভরা লজ্জা নিয়ে। লজ্জা আর ভয় নিয়ে তাদের ভার্সিটি লাইফ শেষ করতে হবে। খোঁয়াড়ে যেমন বেঁধে রাখা হয় গরু, ছাগল, মোষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন এমনই একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, একচোখা খোঁয়াড়।

সম্প্রতি টিএসসিতে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটা খুব সাধারণ ও গুরুত্বহীন একটা ঘটনা। প্রশাসন কত দ্রুত টের পেয়ে গেল একটি ছেলে ও একটি মেয়ে একটা রুমে রাত কাটাচ্ছে। তবু আমার হাসি পাচ্ছে এই ভেবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান কত শত সমস্যা রয়েছে। যা দীর্ঘ দিন ধরে দিনের পর দিন চলে আসছে কিন্তু প্রশাসন টের পাচ্ছে না! যা হোক, খবর পেয়ে টিএসসি থেকে তড়িঘড়ি করে তাদেরকে বের করা হলো, ভয়ভীতি ও জিঙ্গাসাবাদ চললো। তারপর নিউজ পোর্টালগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়লে তাদের টিআরপি বাড়াতে সহযোগিতা করা হলো। 

ছেলে ও মেয়েটির ছবি ঘোলাটে না করেই নিউজ প্রকাশ করা হলো, ‘টিএসসিতে দুই ঢাবি শিক্ষার্থীর রাত্রী যাপন’! এহেন সংবাদের ফলে সামাজিক ভাবে হেয় হবে কেবল ওই মেয়েটি। ছেলেটির কিছু হবে না, ওকে দেওয়া হবে বাহবা। ইতোমধ্যে মনে করেন শুরু হয়ে গেছে। মেয়েটার কিছুটা হলেও সৎ সাহস আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সে বলতে পেরেছে, ‘হলের গেট দশটায় বন্ধ হয়ে গেছে, আমি বাইরে ছিলাম, আমার থাকার আর জায়গা ছিলো না, তাই এখানে থাকছি।’ এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম আবাসিক ব্যবস্থার প্রতি নিষ্পেষিত মেয়েদের একটা চপেটাঘাত ছিলো। 

এক সাহিত্যিপ্রেমি রাজনৈতিকতো ডাকসু প্রচারণায় সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে বলেছিলেন, ‘এ ক্যাম্পাসে আমরা গান হবো, ফুল হবো আর কিছু ঋন হবো জারুল গাছের কাছে।’ অনেক সময় রাতের বেলা ক্যাম্পাসে কনসার্ট হয়। মেয়েদের হল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু গান চলতে থাকে, ছেলেরা উল্লাস করতে থাকে। মেয়েরা বঞ্চিত হয়। তাই এ ক্যাম্পাসে মেয়েরা ফুল হয়েছে কিন্তু গান হবার সুযোগ তাদের দেয়া হয় নাই। এভাবে লিঙ্গবৈষম্য আর কতকাল চলবে! অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যাম্পাসে আর কতকাল উপেক্ষিত হবে নারীর স্বাধীনতা?

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[প্রিয় পাঠক, মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে বাংলা রানার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। মুক্তমত কিংবা বাংলা রানারে প্রকাশিত কোন মতামতের প্রতিক্রিয়া পাঠাতে পারেন brtube717@gmail.com এই ঠিকানায়]