বাঁশ। সভ্যতার যাত্রা পথে যার বহু অবদান। কৃষিভিত্তিক সমাজে মই থেকে শুরু করে মাথা গোঁজার ঠাই ঘর নির্মাণ কিংবা শত্রু তাড়ানোরসহ নানা কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে এই বাঁশ। বাঁশের প্রচুর ব্যবহার থেকে চট্টগ্রামের একটি উপজেলারই নাম পড়ে গেছে বাঁশখালী! বাঁশময় এই বাংলায় বাঁশ নিয়ে গর্ব করার মত ইতিহাসও আছে। তিতুমীরের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামীদের দূর্গঘাটি তৈরি হয়েছিল এই বাঁশ দিয়েই, যা ‘‘বাঁশের কেল্লা’’ নামে পরিচিত।
শুধু মানুষের ব্যবহারিক জীবনেই নয়, বাঁশ তার নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে সংগীত জগতেও! বাঁশের তৈরি বাঁশির সুরের প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ পাওয়া দায়। ব্যবহারিক ও সঙ্গীত জগৎ ছাপিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও পৌঁছে গেছে বাঁশের অবদান!
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর 'বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই' কবিতাটি পড়েনি কিংবা শুনেনি এমন বাঙালি বাংলায় নেই! এছাড়া সব হারিয়ে মানুষ যখন নিরুদ্দেশ যাত্রা করে সেই সর্বশান্ত মুহূতেও সঙ্গী হয় এই বাঁশ! আর এ জন্যই বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ- ‘হাতে হেরিকেন সঙ্গে বাঁশ’! (সর্বনাশ!!!)
আবার কাউকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে সম্মান নষ্ট করা অর্থে বাংলায় ‘বাঁশ দেয়া’ নামে একটি শব্দের বহু প্রচলন আছে। এমনিভাবে অন্যের সম্মান নষ্ট করাসহ নানা সময়ে, নানা কাজে যার বহুবিধ ব্যবহার, সেই বাঁশ এবার নিজের মর্যাদা খুইয়েছে!
অবাক হচ্ছেন? খুলে বলছি ব্যাপারটা, ভারতে এতদিন বাঁশকে ‘গাছ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং কেউ বাঁশ কাটলে তা গাছ কাটা (বৃক্ষ নিধন) আইনের আওতায় পড়ত। কিন্তু ২০১৭ সালের শেষের দিকে ভারতের রাজ্যসভার বেশিরভাগ সদস্যই কণ্ঠভোটে একটি আইন পাশ করেছেন। তারা একমত হয়েছেন যে, ‘বাঁশকে আর ‘গাছ’ বলে ডাকা যাবে না। এটাকে ‘তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ’ হিসেবে গণ্য করা হবে’।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ১৯২৭ সালের ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্টে বাঁশকে ‘গাছ’ বলা হয়েছে। দেশটির লোকসভাতে ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ওই আইনের একটি সংশোধনী প্রস্তাব পাস করা হয়। পরে ২৭ ডিসেম্বর দেশটির রাজ্যসভায় নতুন ওই বিলটি পাশের মধ্য দিয়ে বাঁশ তার পূর্বের মর্যাদা হারিয়ে ‘তৃণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশটির নতুন বন আইনে ‘জঙ্গলের বাইরে জন্মানো’ বাঁশ কাটা এবং তা পরিবহনের ক্ষেত্রে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে ‘বনের মধ্যে জন্মানো’ বাঁশকে ‘গাছ’ বলেই বিবেচনা করা হবে এবং তা কাটা বা পরিবহন করা পূর্বের মতোই নিষিদ্ধ থাকবে।
আইন যেটাই হোক আর যেমনই হোক, ভারতীয় উপমহাদেশের বিরোধী দলের কাজ হল তার সমালোচনা করা! তাই সেই চিরায়ত নিয়ম মেনে এই বিলটিরও সমালোচনা করেছে কয়েকটি বিরোধী দল। কোনো রকম আলোচনা না করেই এই বিল পাস করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তারা বলেছেন, ওই আইনের ফলে শিল্পপতিরা লাভবান হবেন! সংসদের বাইরে থাকা বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাও ওই বিলের সমালোচনা করেছেন।
তবে ওই একই বছর বাংলাদেশে বাঁশকে রডের মর্যাদা দিয়েছিল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান! প্রতিষ্ঠানটি চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সরকারি ভবন নির্মাণ করে। ওই ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার ঘটনা ঘটে যা, চারদিকে তুমুল হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল।