ইন্টারনেট আসক্তি: শৈশবে ডেকে আনছে শিশুর সর্বনাশ

এম.এস.আই খান
শুক্রবার, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯


ইন্টারনেট, যা এখন বিশ্বময় এক জাদুর নাম। যাতে ছুঁয়ে দিলেই চলে আসে বিশ্বের সকল প্রান্তের সব ধরণের তথ্য। শুধু তথ্যই নয় যে কোন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা বিনোদন চাহিদা পূরণে এখন ইন্টারনেটের জুড়ি নেই। অবসর সময়ের একাকীত্বের বিরক্তি কাটানোর জন্য ইন্টারনেটের পরতে পরতে সাজানো আছে নানা আয়োজন। আছে সিনেমা, গান, নাটক, কার্টুন, খবর, টকশো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ শত বিনোদনের ঝুলি। যে ইন্টারনেট গোটা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। সেই ইন্টারনেট এখন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে নানা ক্ষেত্রে নানা প্রেক্ষাপটে। শিশুর সোনালী শৈশব এখন হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটময়। যাকে বলা হয় ‘আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ’ সে জীবনের যাত্রা পথেই পতিত হচ্ছে এক ভয়াবহ আসক্তিতে। শিশুদের ইন্টারনেট আসক্তি এখন শৈশবেই ডেকে আনছে সর্বনাশ।

সম্প্রতি গবেষকরা ইন্টারনেট আসক্তিকে মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন। সারাদেশে শিশুদের মধ্যে এখন এই আসক্তির পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে। শহুরে শিশুদের এই আসক্তির হার সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে,  এর ফলে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মোবাইল ফোনের বিকিরণ থেকে চোখের সমস্যাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বাবা-মা উভয়েই বাইরে কাজ করেন এমন পরিবারে দেখা যাচ্ছে, শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে কাজে যাচ্ছেন বাবা-মা। এমনি করে নানা ঘটনা কিংবা পরিস্থিতির মুখে বাচ্চাদের হাতে ইন্টারনেট তুলে দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তাদের কোন টাইম বেধে দেওয়া হচ্ছে না। ধরে নেওয়া হয় যে, বাচ্চা দেখে যখন তৃপ্ত হবে তখন আপনা-আপনি রেখে দিবে। কিন্তু তারা জানে না যে, ইন্টারনেট দেখে শিশুরা কখনোই তৃপ্ত হয় না। বরং তাদের আসক্তি আরো বাড়তে থাকে। ফলে ক্রমেই তারা চরম মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়ে। যা একটি শিশুর জন্য খুবই বিপদজনক। এক পর্যায়ে দেখা যায়, খাওয়ার সময়েও তারা দেখছে কার্টুন কিংবা ভিডিও গান। পরবর্তীতে ফোন বা ট্যাব ছাড়া শিশুকে সামলানো যায় না। না দিলেই শুরু হয়ে যায় রাগ, জিদ, চিত্কার কিংবা ভাঙচুর।

এটা এমন আকার ধারণ করে যে, এর জন্য বাচ্চারা স্কুলে যেতে চায় না, পড়তে বসতে চায় না, বাইরে খেলতে যায় না। ওদের কোন বন্ধু গড়ে ওঠে না। তাদের একটাই বন্ধু সেটা ইন্টারনেট-ইউটিউব। অনেক বাবা-মা জানতেই পারে না যে, তার ৬ বছরের বাচ্চাটা ইন্টারনেটে পর্ণগ্রাফি দেখছে। এখন এমন ঘটনাও ঘটছে যে, বাচ্চা অনলাইনে কোন একটা খেলনা কিংবা তার পছন্দের অন্য কিছু অর্ডার করে ফেলে। পণ্য এসে বাসার দরজায় হাজির হয়ে যায় অথচ মা জানেও না। বাবা জানলে সন্তানকে মারবে এই ভয়ে মা তখন সেই অনলাইনের বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এখন অনলাইনে ব্লুহোয়েলের মত বেশ কিছু বিপদজনক খেলাও চালু হয়েছে। যা বাচ্চাদের জীবন পর্যন্ত করে নেয়, তাদের অপরাধী কিংবা গ্যাংস্টার হতে অনুপ্রেরণা জোগায়। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপ অনুযায়ী, এক থেকে পাঁচ বছরের শতকরা ৯০ ভাগই মোবাইল ইন্টারনেটে আসক্ত। 

এই সমস্যা ক্রমেই শিশুকে এক অন্ধ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  বলা হচ্ছে, সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টার বা এর বেশি যারা সামাজিক মাধ্যমে ডুবে থাকেন তারা আসক্ত। তাই ইন্টারনেট ব্রাউজের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, সন্তান যখন ইন্টারনেট চালাবে তখন বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের পাশে বসে থাকা এবং অবশ্যই সময় বেঁধে দিতে হবে। কখনোই যাতে তারা একাকী এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সুযোগ না পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

চিকিৎসক তানজিনা আল-মিজানের পরামর্শ,  বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে তাতে কিডস মোড অন করে দিতে পারলে ভালো। তাহলে শিশু কি গেম খেলছে আর ইন্টারনেটে কি সার্চ দিচ্ছে তা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নিজের কোনো পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখলেও কিন্তু বাচ্চা যখন-তখন মোবাইল নিয়ে খেলতে পারবে না। তাছাড়া আজকাল বিভিন্ন ভিডিও শেয়ারিং সাইটে নানাধরনের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান থাকে যাতে ছবি আঁকা, কবিতা আবৃত্তি এগুলো শেখানো হয়। সেই দিকগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে অনেক ভালো।

এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম এ মোহিত কামাল বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সন্তানকে নির্দিষ্ট করে বলে দিতে হবে, তুমি এত ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবা। এতটা থেকে এতটা ব্যবহার করতে পারবা। পিতা-মাতাকে এ ক্ষেত্রে কড়া হতে হবে। আমরা তার যৌক্তিক দাবি মেটাবো কিন্তু অযৌক্তিক দাবি আমরা উপেক্ষা করব কৌশলে। যখন আমরা অযৌক্তিক দাবি পূরণ করব তখন বাচ্চা প্রশয় পেয়ে যায়। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, প্রশয় পেলে বাচ্চারা গোল্লায় যায়। একেবারেই গোল্লায় যায়। এটাই বিজ্ঞান।