ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে মশা, কামান দেগেও নেই নিস্তার!

এম.এস.আই খান
মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯


‌‌‌''মশা মারতে কামান দাগা" বাগধারাটি "তুচ্ছ কাজে বেশি শক্তি প্রয়োগ" অর্থে ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে এখন আর মোটেও তুচ্ছ নেই। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন যখন ফিবছর কোটি কোটি টাকা মশা নিধনে খরচ করেও কোন কূল কিনারা না পায়, তখন মশা মারা যে কোন মামুলী বিষয় নয় সেটি বোঝাই যাচ্ছে। চলতি বছর ডেঙ্গু আতঙ্কে গোটা দেশ যখন অস্থির তখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এডিস মশার বিরুদ্ধে  যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে সেই যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণের আগেই অনেকটা অ্যাকশন সিনেমার দ্বিতীয় পর্বের মত করে বেশ নির্বিঘ্নে ও বিস্তর পরিসরে বেড়ে উঠছে নতুন এক মশার লার্ভা। তবে এবার আর এডিস নয়, শীতের দূত হিসেবে গত অক্টোবর থেকেই মানুষের বিরুদ্ধে রক্তচোষা সেনা মোতায়েন করতে শুরু করেছে কিউলেক্স মশা। নতুন এই কিউলেক্স বাহিনীর আক্রমণে 'মশার উৎস বা প্রজনন ক্ষেত্র' ধ্বংসের যাবতীয় তৎপরতা যেন ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। মশার হাত থেকে বাঁচতে মশারীর নিচে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে মানুষকে।

এদিকে ডেঙ্গু যদ্ধের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে প্রবল বেগে শুরু হওয়া এডিস মশার আক্রমণ এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এখনো থেমে থেমে আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আয়েশা আক্তারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ১২ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৩ ডিসেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রােগী ভর্তি হয়েছে ৪৪ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র রাজধানী শহর ঢাকাতেই ২৪ জন এবং ঢাকার বাইরে সারাদেশে ২০ জন। আর বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হসপাতালে মােট ২২০ জন রোগী ভর্তি আছেন। ডা. আয়েশা আক্তারের দেওয়া তথ্য থেকে আরো জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সর্বমােট ১ লক্ষ ৯২৩ জন রোুগী ভর্তি হয়েছেন। ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৩৯ জন।  রোগতত্ত্ব, রােগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৪ টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আইইডিসিআর ২১১ টি মৃত্যু পর্যালােচনা সমাপ্ত করে ১৩৩টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ কমলেও কিউলেক্স মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, স্ত্রী কিউলেক্স মশার মাধ্যমে অসুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে ফাইলেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে। ‘গোদ’ নামে পরিচিত এই রোগের কারণে হাত-পা ফুলে যায় ও ঘনঘন জ্বর হয়। যদিও ডিএসসিসি বলছে, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ২৮ অক্টোবর থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে সেই অভিযান কিউলেক্স মশার আক্রমণে লাগাম টেনে ধরতে পারেনি।

নগরবাসীর অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে যেভাবে মশকনিধন কার্যক্রম চালানো হয়েছিল তা এখন চোখে পড়ছে না। ফলে কিউলেক্স উপদ্রব বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কর্যক্রমে ঢিল দেওয়া যাবে না। মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি বাড়াতে হবে জনসচেতনতাও। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গুর সময় যেভাবে মশকনিধন কার্যক্রম চালানো হয়েছিল, এখন তা আর নেই। তাই কিউলেক্স মশা বেড়েছে। তবে নতুন করে দুর্যোগ এড়াতে হলে মশকনিধন কার্যক্রমে ঢিলেমি দেওয়া যাবে না। কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এখনই জোর দিতে হবে। মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

কিউলেক্স মশার উপদ্রব বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গত ২৮ অক্টোবর থেকে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচটি করে ওয়ার্ডে জরিপ করা হচ্ছে। জরিপকারী কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানান, মৌসুমের শুরুতেই লার্ভি সাইড লিকুয়েড ছিটানোর মাধ্যমে কিউলেক্স মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিউলেক্স মশার প্রাদুর্ভাব সাধারণত প্রতি বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত থাকে। বর্তমানে দুই সিটিতে যেসব মশা দেখা যায় এর ৮০ থেকে ৯০ ভাগই কিউলেক্স মশা। এই মশার কামড়ের ফলে গোদ রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে গোদ ছড়ানোর আশঙ্কা কম। কারণ কিউলেক্স মশা প্রায় ১০ হাজার বার কামড়ালে এই রোগ হয়। এর সঙ্গে রোগীকে কৃমি রোগে আক্রান্ত হতে হবে। তবে এ বিষয়ে আরো গবেষণার দরকার রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের দেশে গবেষণা কম। আইসিডিডিআরবি এ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১২ জন কীটতত্ত্ববিদের সমন্বয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডে ৫৪০টি জায়গা শনাক্ত করে ৬২০টি হটস্পট নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জায়গায় রয়েছে কিউলেক্স মশার প্রজননস্থল। ঢাকা দক্ষিণের এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তর্গত রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর গেণ্ডারিয়া, বনশ্রীর মতো এলাকাগুলোর বাড়িঘর-স্থাপনা, ড্রেন, পুকুর, খাল ও ডোবায় প্রচুর পরিমাণে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সায়েদাবাদ, ধলপুর, গোলাপবাগ, বিবির বাগিচার ১ থেকে ৪ নম্বর গেটসহ বেশ কিছু এলাকায় মশার উপদ্রব আগের চেয়ে বেড়ে গেছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ডিএসসিসির ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ ফারুক সড়ক, নবীনগর ও যাত্রাবাড়ী এলাকার লোকজনও মশার উপদ্রবের অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা শরিফ আহমেদ বলেন, ‌'এখন মশার কারণে আমরা দিশেহারা। মশারি টানিয়েও শান্তিতে থাকতে পারছি না। মশারি উঁচু করে ভেতরে ঢুকলে বা বের হতে গেলেও মশা ঢুকে যায়।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মারুফ বলেন, এখন দিন-রাত সবসময়ই বাসায় মশারি টাঙানো থাকতে হয়। তবে রাতের বেলা সবচেয়ে বেশি মশা। মশার কামড় থেকে বাঁচতে এখন দিন রাত সব সময়ই মশারী টাঙিয়ে পড়ালেখা করতে হয়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাবিলা জাহান বলেন, ''আমার বাসায় ছোট বাচ্চা আছে। মশার কারণে বেশ বিপদে আছি। অতিরিক্ত কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার করা যায় না। আর অল্প পরিমাণে অ্যারোসল দিলে মশাও যায় না।''

বাসা-বাড়ি, অফিস, খেলার মাঠ সর্বত্রই মশা আর মশা। গোটা রাজধানী জুড়েই এখন সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে মশারা। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফ্রান্সের রেইন অব টেরর (ত্রাসের রাজত্ব)'র মত করে মশার জ্বালা-যন্ত্রণায় নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করেছে নগরবাসীর। জানা গেছে, মশা নিধনে বাজেটের পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। এ বছর দুই সিটিতে মশা নিধন কর্মসূচি হাতে নিয়ে বাড়ানো হয়েছিল বাজেটও। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বাজেটে মশা নিয়ন্ত্রণে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাত্ গত অর্থবছরের চেয়ে এবারে ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবারের বাজেটে মশা নিয়ন্ত্রণ খাতে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। যা আগের তুলনায় অনেক বেশি।

এ বিষয়ে ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ডেঙ্গুর সময়ে আমরা যেভাবে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগীতা লক্ষ্য করেছিলাম এখন সেটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শীতের সময়ে বিভিন্ন পুকুর-ডোবায় থাকা কচুরি পানাগুলো কিউলেক্স মশার আধার হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা কচুরিপানাগুলো অপসারণের চেষ্টা চালাচ্ছি। এই পুকুর-ডোবা আমাদের অধীনে নয় ওয়াশা বা বিভন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে। যার ফলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আর ড্রেনগুলো আটকা থাকায় মশা জন্ম নিচ্ছে। আমাদের ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শরীফ আহমেদ বলেন, ‘মশার যে ওষুধ এখন ছিটানো হচ্ছে, তা পরীক্ষিত ও কার্যকর। তবে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কাভার্ড ড্রেনের মধ্যে ওষুধ ছিটানো। সেটা যথাযথভাবে ছিটানো যায় না বলেই মশার উপদ্রব কমছে না। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে সম্প্রতি দুবার ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হয়েছে। এখন ওয়ার্ডগুলোতে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। আমরা মশা কমানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

ডিএনসিসির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা এ এস এম মামুন জানান, কিউলেক্স মশা দমনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে ঢাকার ড্রেনগুলো ঢাকা থাকার কারেণে সেখানে মশার ওষুধ পৌঁছাচ্ছে না। এর ফলে সেখান থেকে মশা উৎপন্ন হচ্ছে। তাছাড়া বর্ষার সময়ে পানির প্রবাহ থাকে। কিন্তু শীতের সময়ে প্রবাহ থাকে না, ফলে পানি জমে যায় এবং সেখান থেকে মশা জন্ম নেয়। শুধু সিটি কর্পোরেশন নয় মশা দমনে নগরবাসীর সহযোগীতা ও সচেতনতা দরকার। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।